কলকাতা: একাধিক প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে এবার দর্শকদের কাছে পৌঁছনোর অপেক্ষায় কিংশুক দে-র কনসেপ্টে, কিংশুক দে ও সুরজিত সাহেব মুখোপাধ্যায়ের সৃষ্টিতে এবং তারক দাসের পরিচালনায় তৈরি বাংলা ডার্ক কমেডি-ড্রামা ‘হ্যারি ওম’। নির্মাতাদের দাবি, ২০২৫ সালে ছবির শুটিং চলাকালীন তৎকালীন ফেডারেশন প্রেসিডেন্টের তরফে শুটিং বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ছবিটি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির প্রচলিত ব্যবস্থার কিছু দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলে বলে নির্মাতাদের বক্তব্য এবং সেই পরিস্থিতিতে তাঁরা আদালতেরও দ্বারস্থ হয়েছিলেন।
ছবির অভিনেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে ছবির শুটিং শেষ করা হয়েছে। তাঁর কথায়, শুটিং বন্ধ করে দেওয়ার খবর তাঁরা শেষ দিন জানতে পেরেছিলেন, কিন্তু সমস্ত বাধা অতিক্রম করেই সিনেমাটি সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়েছে। খুব শীঘ্রই ‘হ্যারি ওম’ দর্শকদের সামনে আসবে বলেও আশাবাদী তিনি।
এর আগে ২০২৪ সালে কিংশুক দে-র ছবি ‘দ্য রেড ফাইলস’-কেও সরকারি ও বেসরকারি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের ক্ষেত্রে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছিল বলে নির্মাতাদের দাবি। সেই অভিজ্ঞতার পর আরও একবার প্রতিকূলতা পেরিয়ে ‘হ্যারি ওম’ নিয়ে দর্শকদের সামনে হাজির হতে চলেছেন তাঁরা।
ছবির কেন্দ্রে রয়েছে হারিসাধন দাস, যে নিজেকে ‘হ্যারি’ বলে পরিচয় দেয়। জীবনে একের পর এক ব্যর্থতা, চাকরি হারানো এবং প্রেমে বিচ্ছেদের পর তার কাছে প্রায় প্রতিটি সমস্যারই একমাত্র উত্তর—‘সব দোষ ভগবানের!’ কিন্তু আচমকাই তার জীবনে এসে হাজির হয় ভগবানের কাউন্সিলর। সেখান থেকেই শুরু হয় হ্যারির জীবনের এক অপ্রত্যাশিত অধ্যায়।
পরবর্তীতে কাজের সূত্রে হ্যারিকে যেতে হয় নিশ্চিন্তপুর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। শহুরে জীবন ছেড়ে গ্রামে যাওয়ার বিষয়ে প্রথমে অনাগ্রহী হ্যারি সেখানে গিয়ে মুখোমুখি হয় গ্রামবাংলার বাস্তবতার। স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকট, সীমিত সুযোগ-সুবিধা, স্থানীয় রাজনীতি, মানুষের সম্পর্ক এবং প্রতিদিনের লড়াই ধীরে ধীরে তার জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। নিজের প্রয়োজনেই গ্রামে যাওয়া হ্যারি ক্রমশ জড়িয়ে পড়ে গ্রামের মানুষের সমস্যার সঙ্গে। গল্পটি সেই জায়গা থেকেই প্রশ্ন তোলে—পরিবর্তনের জন্য কি সবসময় সরকার বা রাজনীতিবিদদের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে, নাকি একজন সাধারণ মানুষও নিজের জায়গা থেকে পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে পারে?
হ্যারি চরিত্রে অভিনয় করেছেন সৌম্য মুখার্জী। তাঁর মতে, হ্যারি তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম বিশেষ চরিত্র—মিষ্টি স্বভাবের, খানিকটা অদ্ভুত এবং অত্যন্ত আকর্ষণীয় এক মানুষ। চাকরি হারানো, প্রেমে বিচ্ছেদ, বাবাকে ছাড়া বেড়ে ওঠা এবং আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে যাওয়া হ্যারির জীবনে গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্র নতুন মোড় নিয়ে আসে। ডার্ক কমেডি তাঁর পছন্দের জঁর হওয়ায় চিত্রনাট্য তাঁকে প্রথম থেকেই আকৃষ্ট করেছিল বলে জানিয়েছেন সৌম্য। তাঁর মতে, কমেডির আবহে বর্তমান প্রজন্মের অনিশ্চয়তা, সামাজিক সমস্যা এবং গ্রামের মানুষের বাস্তব জীবনকে তুলে ধরা হয়েছে।
মধুমিতা চরিত্রে রয়েছেন মৌমিতা হরি। গ্রামের শান্ত, পরিণত ও ধৈর্যশীল মেয়ে মধুমিতা পড়াশোনার জন্য দূরের কলেজে যাতায়াত করে। অল্প বয়সে মাকে হারিয়ে বাবার কাছেই তার বেড়ে ওঠা। মানুষের মূল্য ও সম্পর্কের গুরুত্ব বোঝা এই চরিত্রটির সঙ্গে গল্পটি শোনার পর থেকেই নিজের যোগসূত্র অনুভব করেছিলেন মৌমিতা। তাঁর মতে, ‘হ্যারি ওম’ একটি মাটির কাছাকাছি, আবেগঘন গ্রামের গল্প, যেখানে মানুষের সম্পর্ক, প্রতিদিনের সংগ্রাম, স্থানীয় রাজনীতি, ভালোবাসা ও উষ্ণতার পাশাপাশি উঠে এসেছে গ্রামবাংলার নিজস্ব আবহ।
ছবির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিশ্বনাথ বসু। গল্প এবং শুটিংয়ের লোকেশন তাঁকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল বলে জানিয়েছেন তিনি। যে গ্রামে শুটিং হয়েছে, সেই পরিবেশকে নিজের গ্রামের মতোই আপন মনে হয়েছিল তাঁর। ছবিতে তাঁর চরিত্র ও সংলাপের মধ্যেও রয়েছে নতুন অভিজ্ঞতা। সৌম্য মুখার্জীর চরিত্রের সঙ্গে তাঁর চরিত্রের সম্পর্ক ও যাত্রার মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও উঠে এসেছে—শুধু ঈশ্বরের ওপর নির্ভর না করে মানুষকেই নিজের পথ খুঁজে নিতে হবে।
ছবিটির সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগসূত্রের কথাও জানিয়েছেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তাঁর মতে, গল্পটি শোনার পর মনে হয়েছিল, এটি যেন তাঁর নিজের গল্প; পরে কাজ করতে গিয়ে বুঝেছেন, সেই অনুভূতি আসলে আরও অনেক মানুষের। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও টিমের দৃঢ়তার কারণে ছবিটি সম্পূর্ণ হয়েছে বলে জানান তিনি।
‘হ্যারি ওম’-এ অভিনয় করেছেন সৌম্য মুখার্জী, মৌমিতা হরি, বিশ্বনাথ বসু, অরিজিৎ দত্ত, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, শান্তনু ঘোষ, কৌশিকী, প্রতীক শর্মা, স্বাতী মুখার্জী, সৌমেন দত্ত, অঙ্কুর রায়, দীপঙ্কর এবং কিংশুক দে। ছবির গল্প লিখেছেন কিংশুক দে। চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন কিংশুক দে ও ঐশিক। প্রযোজনায় রয়েছে কলকাতা টকিজ, আউরা এন্টারটেইনমেন্ট ও সিং এন্টারটেইনমেন্ট।
ডার্ক কমেডি, আবেগ, সম্পর্ক, গ্রামবাংলার জীবন, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকট এবং সামাজিক ব্যঙ্গের মেলবন্ধনে ‘হ্যারি ওম’ তৈরি করেছে এক ভিন্নধর্মী আবহ। ছবির গল্পের মতোই ছবিটির নির্মাণযাত্রাও ছিল নানা বাধা ও প্রতিকূলতায় ভরা। এবার সেই সমস্ত অধ্যায় পেরিয়ে দর্শকদের সামনে আসার অপেক্ষায় ‘হ্যারি ওম’।



