৫০ বছরের দুর্গাপূজা বন্ধের মুখে! পুজো কমিটি ঘিরে তীব্র বিবাদ উদয়রামপুরে

রাজনৈতিক টানাপোড়েনে অনিশ্চিত ঐতিহ্যবাহী পুজো, প্রশাসনের হস্তক্ষেপের দাবি গ্রামবাসীদের

রমেশ রায়
দক্ষিণ ২৪ পরগনা | বিষ্ণুপুর
দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা দুর্গাপূজা এবার বন্ধের মুখে। পুজো কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া মতবিরোধ, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং পরস্পরবিরোধী অভিযোগে উত্তপ্ত দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিষ্ণুপুরের উদয়রামপুর গ্রামের পরিস্থিতি। স্থানীয়দের দাবি, গ্রামের রেক্রিয়েশন ক্লাবের মাঠে প্রায় ৫০ থেকে ৫৪ বছর ধরে নিয়মিত দুর্গাপূজা হয়ে আসছে। অথচ চলতি বছরে সেই ঐতিহ্যবাহী পুজো আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
গ্রামবাসীদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতি বছর দুর্গাপূজার প্রায় তিন মাস আগে বৈঠকের মাধ্যমে পুজো কমিটি গঠন করা হয়। এ বছরও সেই প্রথা মেনেই একটি পুজো কমিটি গঠন করা হয় এবং রেক্রিয়েশন ক্লাবের সভাপতি উত্তম মিস্ত্রিকে পুজো কমিটির সভাপতি করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, উত্তম মিস্ত্রি ১৩৭ নম্বর বুথের মণ্ডল সভাপতি হওয়ায় তাঁর পদমর্যাদার প্রতি সম্মান রেখেই তাঁকে পুজো কমিটির সভাপতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল।
তবে গ্রামবাসীদের অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে বর্ষা শুরু হওয়ার পর উত্তম মিস্ত্রি ওই কমিটি মানবেন না এবং নতুন করে পুজো কমিটি গঠন করতে হবে বলে জানান। তাঁদের আরও অভিযোগ, শুধুমাত্র বিজেপির সদস্যদের নিয়ে নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু উদয়রামপুরে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ বসবাস করায় এই প্রস্তাবে আপত্তি জানান গ্রামবাসীদের একাংশ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, দুর্গাপূজা কোনও রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি নয়—এটি সমগ্র গ্রামের মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। তাই রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সকলকে সঙ্গে নিয়ে পুজো করার পক্ষেই তাঁরা সওয়াল করছেন।
এরই মধ্যে গত ১৮ আগস্ট উত্তম মিস্ত্রি কয়েকজন তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্য এবং বহিরাগত যুবকদের সঙ্গে নিয়ে এসে ক্লাবের সদস্যদের মারধর করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গ্রামবাসীদের দাবি, ওই ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি আহত হন। তাঁদের অভিযোগ অনুযায়ী, দু’জনের মাথা ফেটে যায়, একজনের পায়ে গুরুতর চোট লাগে, একজনের চোখে আঘাত লাগে এবং আরও এক যুবককে বুকে মারধরের পর সিটি স্ক্যান করাতে হয়।
ঘটনার পর গ্রামবাসীদের পক্ষ থেকে বিষ্ণুপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে তাঁদের অভিযোগ, এখনও পর্যন্ত পুলিশ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। স্থানীয় বিধায়ক অগ্নিশ্বর নস্করের কাছেও তাঁরা বিষয়টি নিয়ে গিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন বাসিন্দারা। কিন্তু সেখান থেকেও সমস্যার কোনও স্থায়ী সমাধান মেলেনি বলে তাঁদের অভিযোগ।
অন্যদিকে, কয়েকজন মহিলা বাসিন্দার তরফে আরও গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। তাঁদের দাবি, তাঁদের বক্তব্য না শুনলে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এমনকি যাঁরা ইতিমধ্যেই ৩ হাজার টাকা পেয়েছেন, তাঁদের কাছ থেকে সেই অর্থ ফিরিয়ে নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। তবে এই অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীদের বক্তব্য, “৩ হাজার টাকার বিনিময়ে যদি দুর্গাপূজা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে আমরা সেই টাকা চাই না। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা মায়ের পুজো কোনওভাবেই বন্ধ হতে দেব না।”
স্থানীয়দের দাবি, উদয়রামপুর গ্রামে প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার পরিবারের বসবাস। তাঁদের আরও অভিযোগ, দুর্গাপূজার জন্য প্রতিবছর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে যে অনুদান আসত, সেই সমস্ত উৎস থেকেও অনুদান বন্ধ করার চেষ্টা চলছে।
গ্রামবাসীদের অভিযোগ, কয়েকজনের ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্যের জেরে পাঁচ দশকেরও বেশি পুরনো দুর্গাপূজা আজ সংকটের মুখে। ইতিমধ্যেই ফুটি পুজো হয়ে গেলেও পুজোর মাঠে বাঁশ পড়ে রয়েছে; কিন্তু প্যান্ডেল তৈরির কাজ এখনও শুরু করা সম্ভব হয়নি।
পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন গ্রামবাসীরা এবার সংবাদমাধ্যমের দ্বারস্থ হয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর তাঁদের উপর হামলা হতে পারে কিংবা মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা হতে পারে।
তাঁদের সাফ বক্তব্য, “যেভাবেই হোক আমরা দুর্গাপূজা করতে চাই। প্রয়োজনে প্রশাসনের দ্বারস্থ হব, প্রয়োজনে আরও উচ্চতর কর্তৃপক্ষের কাছে যাব। কিন্তু গ্রামের মায়ের পুজো বন্ধ হতে দেব না।”
গ্রামবাসীদের পক্ষ থেকে প্রশাসনের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যেন বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেন এবং কোনও রাজনৈতিক রং ছাড়াই সকলের অংশগ্রহণে শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা আয়োজনের পরিবেশ নিশ্চিত করেন। তাঁদের আহ্বান—“রাজনীতি নয়, সকলে মিলে আমরা মায়ের পুজো করতে চাই।”
অন্যদিকে, এই বিষয়ে উত্তম মিস্ত্রির সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি পুজোর পক্ষে বা বিপক্ষে নই।” একইসঙ্গে তাঁর দাবি, “ওরা সিপিএম, তৃণমূল করত, ওরা কেন পুজো করবে?”
ফলে উদয়রামপুরের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—রাজনৈতিক মতাদর্শের বিভাজন কি শেষ পর্যন্ত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা দুর্গাপূজার ঐতিহ্যকে থামিয়ে দেবে? নাকি প্রশাসনের সক্রিয় হস্তক্ষেপে সমস্ত পক্ষের মতপার্থক্য দূর করে ফের একসঙ্গে উৎসবের আবহ ফিরবে গ্রামে? উত্তর খুঁজছে উদয়রামপুর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *