২০ বছরের অনিয়মিত হৃৎস্পন্দনে অবশেষে স্বস্তি, মনিপাল হাসপাতালে ৭২ বছরের বৃদ্ধার সফল ‘পালসড ফিল্ড অ্যাবলেশন’

পূর্ব ভারতে প্রথমবার Boston Scientific-এর FARAPULSE™ প্রযুক্তিতে সম্পন্ন হল অত্যাধুনিক চিকিৎসা

কলকাতা, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬: হৃদরোগ চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিসরে এক তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক সংযোজন করল মনিপাল হাসপাতাল, ইএম বাইপাস। পূর্ব ভারতে প্রথমবার Boston Scientific-এর FARAPULSE™ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সফলভাবে সম্পন্ন হল অত্যাধুনিক ‘পালসড ফিল্ড অ্যাবলেশন’ (Pulsed Field Ablation বা PFA)। দীর্ঘ দুই দশক ধরে অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন তথা অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশন (Atrial Fibrillation বা AF)-এর যন্ত্রণায় জর্জরিত ৭২ বছর বয়সি এক বৃদ্ধার শরীরে এই যুগান্তকারী চিকিৎসা প্রয়োগ করা হয়।
কলকাতার নিউ গড়িয়ার বাসিন্দা সিমা দে (নাম পরিবর্তিত)-র ক্ষেত্রে এই চিকিৎসা সম্পন্ন করা হয়। তিনি একজন গৃহবধূ এবং তাঁর স্বামী ভারতীয় রেলের প্রাক্তন কর্মচারী। মনিপাল হাসপাতালের কনসালট্যান্ট কার্ডিওলজিস্ট ও ইলেক্ট্রোফিজিওলজিস্ট ডঃ অশেষ হালদার এই গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেন। তাঁকে সহযোগিতা করেন মনিপাল হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের ডিরেক্টর ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডঃ দিলীপ কুমার।
বৃহস্পতিবার আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে হাসপাতালের পক্ষ থেকে এই চিকিৎসা-সাফল্যের কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়। উপস্থিত ছিলেন ডঃ রবীন্দ্র নাথ চক্রবর্তী, বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি; ডঃ দেবপ্রিয় মণ্ডল, কনসালট্যান্ট—ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি; ডঃ রানা রথোর রায়, কনসালট্যান্ট—ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি এবং লিড কনসালট্যান্ট—ক্লিনিক্যাল কার্ডিওলজি-সহ অন্যান্য চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা।
দুই দশকের বুক ধড়ফড়ানি, শেষ সাত মাসে পরিস্থিতির অবনতি
সিমা দে গত ২০ বছর ধরে মাঝেমধ্যেই তীব্র বুক ধড়ফড়ানি বা অনিয়মিত হৃৎস্পন্দনের সমস্যায় ভুগছিলেন। প্রাথমিক পর্যায়ে উপসর্গটি তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকলেও গত সাত মাসে তাঁর শারীরিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। হৃদরোগজনিত জটিলতার কারণে তাঁকে ওই সময়ের মধ্যে তিনবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। এমনকি একবার তিনি জ্ঞানও হারিয়ে ফেলেছিলেন।
বিভিন্ন ধরনের ওষুধ প্রয়োগ করেও তাঁর অসুস্থতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। ক্রমশ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে ওঠায় চিকিৎসকরা তাঁর ক্ষেত্রে Pulsed Field Ablation বা PFA পদ্ধতি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেন।
তাপ বা অতিরিক্ত শীতলতা নয়, বৈদ্যুতিক তরঙ্গেই সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা
PFA হৃদযন্ত্রের ছন্দজনিত জটিলতা নিরসনে এক নবীন ও অত্যাধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি। প্রচলিত রেডিওফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশন-এর মতো অতিরিক্ত তাপ কিংবা ক্রায়ো-অ্যাবলেশন-এর মতো চরম শীতলতা প্রয়োগ না করে এই পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রিত ও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক শক্তিতরঙ্গ ব্যবহার করে হৃদযন্ত্রের সমস্যাগ্রস্ত অংশে চিকিৎসা করা হয়।
অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশনের ক্ষেত্রে অনিয়মিত বৈদ্যুতিক সংকেতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হল ফুসফুস থেকে হৃদযন্ত্রে রক্ত বহনকারী পালমোনারি ভেন বা ফুসফুসীয় শিরাগুলির সংযোগস্থল। PFA পদ্ধতিতে এই অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক সংকেতকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে পালমোনারি ভেনের চারপাশে একটি কার্যকর বৈদ্যুতিক বিচ্ছিন্নতা বলয় তৈরি করা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘পালমোনারি ভেন আইসোলেশন’ (Pulmonary Vein Isolation)।
প্রচলিত অ্যাবলেশন পদ্ধতির তুলনায় PFA-র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল—আশপাশের সুস্থ কোষ ও টিস্যুর অনিচ্ছাকৃত ক্ষতির সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম রেখে সমস্যার নির্দিষ্ট স্থানে চিকিৎসা প্রয়োগ করা সম্ভব হয়।
দু’দিনেই হাসপাতাল থেকে বাড়ি
সফলভাবে চিকিৎসা সম্পন্ন হওয়ার পর রোগীকে মাত্র দু’দিনের মধ্যেই হাসপাতাল থেকে বাড়ি পাঠানো হয়। বর্তমানে তিনি সুস্থতার পথে রয়েছেন এবং চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছেন।
এই আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি প্রসঙ্গে ডঃ অশেষ হালদার বলেন, “পালসড ফিল্ড অ্যাবলেশন এমন একটি আধুনিক পদ্ধতি, যার মাধ্যমে চরম তাপ বা ঠান্ডা ব্যবহার না করেই অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশনের মতো জটিল রোগের চিকিৎসা করা যায়। এর ফলে পার্শ্ববর্তী টিস্যুর ক্ষতি না করে শুধু সমস্যার জায়গাটিতেই সুনির্দিষ্টভাবে কাজ করা সম্ভব হয়। মনিপাল হাসপাতালে এই প্রযুক্তি চালু হওয়া হৃদরোগের উন্নত চিকিৎসায় একটি বড় পদক্ষেপ।”
মনিপাল হাসপাতাল, ইএম বাইপাসের কার্ডিওলজি বিভাগের ডিরেক্টর ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডঃ দিলীপ কুমার বলেন, “রোগীর জন্য এটি শুধু সাধারণ বুক ধড়ফড়ানি ছিল না। ২০ বছর ধরে ভুগে শেষ কয়েক মাসে তাঁর কষ্ট অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল। বারবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছিল। ওষুধ কাজ না করায় আমাদের বিকল্প চিকিৎসা বেছে নিতে হয়েছিল। PFA পদ্ধতির পর রোগী এখন ভালো আছেন দেখে আমরা আনন্দিত।”
পরিবারের দীর্ঘ উদ্বেগের অবসান
রোগীর ছেলে রাকেশ দে (নাম পরিবর্তিত) জানান, দীর্ঘদিন ধরে মায়ের অসুস্থতার সঙ্গে পরিবারের লড়াই কতটা কঠিন ছিল। তাঁর কথায়, “বছরের পর বছর ধরে মাকে এই কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে দেখা আমাদের পরিবারের জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল। তবে শেষের কয়েক মাস পরিস্থিতি সত্যিই খুব উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছিল। মাকে বারবার হাসপাতালে ভর্তি করাতে হচ্ছিল। যে মানুষটা সারাজীবন এতটা চঞ্চল আর সক্রিয় ছিলেন, তাঁকেই এভাবে অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করতে দেখাটা ভীষণ কষ্টের ছিল।”
তিনি আরও জানান, তাঁর ভাই বিদেশে GI Surgeon হিসেবে কর্মরত এবং তিনিও চিকিৎসা-সংক্রান্ত যাবতীয় আলোচনায় পরিবারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। PFA পদ্ধতির কার্যকারিতা এবং তাঁর মায়ের শারীরিক অবস্থায় এই চিকিৎসার সম্ভাব্য উপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার পর পরিবারের সকলে আলোচনার মাধ্যমে চিকিৎসাটি করানোর সিদ্ধান্ত নেন।
রাকেশ দে বলেন, “এই সময়টায় মাকে টানা ১৭ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল। তবে আমরা অত্যন্ত কৃতজ্ঞ যে তিনি এখন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে এসেছেন। আপাতত তিনি পুরোপুরি বিশ্রামে আছেন এবং ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন। ডঃ অশেষ হালদার, ডঃ দিলীপ কুমার এবং মনিপাল হাসপাতালের পুরো টিমের কাছ থেকে আমরা যে যত্ন ও ভরসা পেয়েছি, তা আমাদের এই পুরো কঠিন পথ চলায় ভীষণ সাহস যুগিয়েছে। একটি পরিবার হিসেবে, মাকে আবার সুস্থ হতে এবং নিজের শক্তি ফিরে পেতে দেখাটাই আমাদের কাছে সবচেয়ে আনন্দের।”
দেশজুড়ে বিস্তৃত মনিপাল হাসপাতালের স্বাস্থ্যপরিসর
Manipal Hospitals ভারতের অন্যতম অগ্রণী সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। সংস্থাটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৮০ লক্ষ রোগীকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়। রোগীকেন্দ্রিক, সহজলভ্য ও উচ্চমানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উন্নত প্রযুক্তি, ক্লিনিক্যাল দক্ষতা, গবেষণা এবং উদ্ভাবনকে একসূত্রে সংযুক্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বর্তমানে মনিপাল হাসপাতালের সর্বভারতীয় নেটওয়ার্কে ১৪টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ৫০টি হাসপাতাল রয়েছে এবং মোট লাইসেন্সপ্রাপ্ত শয্যার সংখ্যা ১৩,৪০০-রও বেশি। শয্যাসংখ্যার বিচারে এটিকে ভারতের বৃহত্তম মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল নেটওয়ার্ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সুবিশাল স্বাস্থ্যপরিসরকে সমৃদ্ধ করছে ১১,০০০-রও বেশি চিকিৎসক এবং ২৫,০০০-রও বেশি কর্মী। রোগীর প্রয়োজনকে সর্বাগ্রে রেখে ক্লিনিক্যাল উৎকর্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের সমন্বয়ে দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষের কাছে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি।
চিকিৎসাক্ষেত্রে গুণমান ও পরিচালনাগত উৎকর্ষের প্রতি মনিপাল হাসপাতালের ধারাবাহিক অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটেছে NABH accreditation-এর মাধ্যমে। এর পাশাপাশি নেটওয়ার্কের একাধিক হাসপাতাল NABL accreditation-এ স্বীকৃত এবং নার্সিং ও জরুরি চিকিৎসাসেবায় উৎকর্ষের জন্যও প্রশংসিত।
৭২ বছর বয়সি সিমা দে-র ক্ষেত্রে পূর্ব ভারতে প্রথমবার FARAPULSE™ প্রযুক্তির সহায়তায় সফল PFA চিকিৎসা তাই শুধু একজন রোগীর দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা লাঘবের ঘটনা নয়; বরং পূর্ব ভারতের হৃদরোগ চিকিৎসাক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর, সূক্ষ্মতর এবং তুলনামূলকভাবে টিস্যু-সুরক্ষিত চিকিৎসার পরিসরকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দেওয়ার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *