আধুনিক চিকিৎসা পরিষেবা, জনস্বাস্থ্য সচেতনতা ও বিপর্যয় মোকাবিলায় দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক গড়ার লক্ষ্য
কলকাতা, ১ সেপ্টেম্বর: স্বাস্থ্যক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী, রাষ্ট্রবাদী এবং ভারতবর্ষের সুপ্রাচীন সনাতনী ঐতিহ্যের প্রতি বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাশীল চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং চিকিৎসাবিদ্যার ছাত্রছাত্রীদের একই ছত্রছায়ায় নিয়ে আসার লক্ষ্যে সর্বভারতীয় সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল ‘সনাতনী স্বাস্থ্য সেনা’ (SSS)। সংগঠনের মূল অভিপ্রায় হল স্বাস্থ্য পরিষেবাকে আরও সহজলভ্য ও সর্বজনীন করে তোলা এবং স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বিপন্ন পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের পাশে সাংগঠনিকভাবে দাঁড়ানো।
কলকাতা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংগঠনের প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনে আহ্বায়ক তথা বিশিষ্ট হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. প্রকাশ কুমার হাজরা বলেন, অতীতে পেশাগত ও সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যক্তি কিংবা সমষ্টিগতভাবে তাঁরা বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। ভবিষ্যতে এই ধরনের পরিস্থিতিতে বিপদগ্রস্তদের পাশে সংগঠন হিসেবে দাঁড়ানোই তাঁদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হবে।
সম্মেলনে উপস্থিত জেরিয়েন্টোলজি বিশেষজ্ঞ ডা. দীপংকর দেবনাথ সংগঠনের বিস্তৃত লক্ষ্য ও কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শহর ও গ্রামের ভৌগোলিক ব্যবধান কিংবা মানুষের আর্থিক অবস্থান নির্বিশেষে সহজলভ্য ও আধুনিক স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া হবে সংগঠনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলিতেও যাতে কোনও ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই ন্যায়সঙ্গত ও সমতাভিত্তিক চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া যায়, সেই লক্ষ্যেও উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
সংগঠনের ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে রোগীর মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষা, সহানুভূতিশীল ও পেশাদার চিকিৎসা পরিষেবা নিশ্চিতকরণ এবং স্বাস্থ্যকে নিছক পরিষেবা নয়, বরং জনগণের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস। একইসঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে স্বনির্ভর করে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
‘সনাতনী স্বাস্থ্য সেনা’ বিশেষ গুরুত্ব দিতে চলেছে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসচেতনতা-র উপর। রোগ দেখা দেওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, রোগের প্রাথমিক ও সতর্কতামূলক লক্ষণ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী রোগের যথাযথ ব্যবস্থাপনা এবং সময়োপযোগী চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নাগরিকদের স্বাস্থ্য-সাক্ষরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পুষ্টি, মাতৃত্বকালীন পরিচর্যা, স্বাস্থ্যবিধি এবং দৈনন্দিন স্বাস্থ্যসম্পর্কিত সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে সচেতন করার পরিকল্পনাও রয়েছে সংগঠনের। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ভ্রান্ত তথ্যের মোকাবিলা এবং বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত স্বাস্থ্যাভ্যাসের প্রসারের লক্ষ্যে তৃণমূল স্তরে কর্মশালা ও ডিজিটাল সচেতনতা কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
সংগঠনের দৃষ্টিভঙ্গিতে শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক সুস্থতার সমন্বয় একটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় জীবনচর্চার পুষ্টি, মননশীলতা ও সুষম দৈনন্দিন রুটিনের নীতিগুলিকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে যুগোপযোগী করে প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ জীবনযাত্রাজনিত রোগের ক্রমবর্ধমান প্রকোপ প্রতিরোধে দৈনন্দিন শারীরিক অনুশীলন, ফিটনেস কর্মসূচি এবং কমিউনিটি যোগাভ্যাসকে উৎসাহিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এর পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, যথাযথ স্যানিটেশন এবং পরিবেশবান্ধব জনস্বাস্থ্য উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবেশগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার উপরও গুরুত্ব আরোপ করা হবে।
সমাজের আর্থিক ও সামাজিকভাবে দুর্বল অংশের মানুষের কাছে চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দিতে ব্যাপক চিকিৎসা প্রচার ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। প্রত্যন্ত ও অনুন্নত অঞ্চলে বিশেষ স্বাস্থ্যশিবির, রোগনির্ণয় পরিষেবা এবং ভ্রাম্যমাণ মেডিক্যাল ভ্যানের মাধ্যমে চিকিৎসা পরিকাঠামো পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনাও সংগঠনের কর্মসূচিতে রয়েছে।
এছাড়াও ডাক্তার, নার্স, গবেষক এবং মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদারদের সমন্বয়ে একটি সুসংবদ্ধ দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা স্বেচ্ছায় নিজেদের সময় ও দক্ষতা সমাজসেবায় নিয়োজিত করতে পারেন।
জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত জরুরি পরিস্থিতি ও প্রাকৃতিক বা অন্যান্য বিপর্যয়ের সময় দ্রুত চিকিৎসা, ত্রাণ, খাদ্য এবং স্যানিটারি সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে একটি বিশেষ বিপর্যয় মোকাবিলা ইউনিট গড়ে তোলার কথাও জানানো হয়েছে।
সংগঠনের সামগ্রিক লক্ষ্য সম্পর্কে আয়োজকদের বক্তব্য, পেশাদার চিকিৎসা-দক্ষতার সঙ্গে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের কর্মশক্তিকে সমন্বিত করে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা পরিকাঠামো গড়ে তোলা। তাঁদের মতে, সুস্থ নাগরিকই একটি শক্তিশালী সমাজের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। ব্যক্তি সুস্থ থাকলে পরিবার সমৃদ্ধ হয়, সমাজের অগ্রগতি ত্বরান্বিত হয় এবং একটি শক্তিশালী ও সুসংহত জাতির ভিত আরও দৃঢ় হয়।
সাংবাদিক সম্মেলনে ন্যাশনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ডা. রাখি মিত্র, ন্যাশনাল স্পোকসপার্সন বিবেক শুক্লা এবং ন্যাশনাল ট্রেজারার সুষ্মিতা মুখার্জি-সহ সংগঠনের অন্যান্য বিশিষ্ট সদস্য ও চিকিৎসকরা উপস্থিত ছিলেন।



Leave a Reply