বঙ্গের ভবিষ্যৎ নগর-দিগন্তের ভিত্তি হতে হবে আস্থা, নিরাপত্তা ও অনবদ্য গুণমানের উপর: দ্রুততর অনুমোদন ও আগামী-প্রজন্মের পরিকাঠামোর পক্ষে সওয়াল অগ্নিমিত্রা পালের — CII Build Expo & Realty East

কলকাতা, ১৯ আগস্ট ২০২৬: পশ্চিমবঙ্গের আবাসন ও নির্মাণ-পরিসর পরিকাঠামোগত রূপান্তর, প্রযুক্তিগত সংযোজন এবং সুস্থিতিশীল নগরায়ণের এক উচ্চাভিলাষী অভিযাত্রায় প্রবেশ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে CII Realty East 2026 & Build Expo 2026 পূর্ব ভারতের ভবিষ্যৎ স্থাপত্যিক বিন্যাস ও অর্থনৈতিক ভূদৃশ্য নিয়ে নীতিনির্ধারণী ও শিল্পমহলের গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময়ের এক তাৎপর্যপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
নিউ টাউনের বিশ্ব বাংলা এক্সিবিশন সেন্টারে উদ্বোধন হওয়া তিন দিনব্যাপী এই প্রদর্শনীতে ৫০টিরও অধিক প্রদর্শক সংস্থা অংশগ্রহণ করেছে এবং প্রথম দিনেই প্রায় ১,০০০ দর্শনার্থীর সমাগম ঘটেছে। পাশাপাশি নীতিনির্ধারক, সরকারি আধিকারিক, আবাসন-নির্মাতা, স্থপতি, পরিকাঠামো বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তি-প্রদানকারী এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পক্ষেত্রের বহু অংশীজনের এক বিস্তৃত সমাবেশ পরিলক্ষিত হয়।
উদ্বোধনী অধিবেশনে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নগরোন্নয়ন ও পৌর বিষয়ক দপ্তরের মাননীয়া ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী শ্রীমতী অগ্নিমিত্রা পাল রাজ্যের নগরকেন্দ্রগুলিকে প্রযুক্তিগতভাবে অত্যাধুনিক, অর্থনৈতিকভাবে প্রাণবন্ত এবং পরিবেশগতভাবে সুস্থিতিশীল বিকাশের চালিকাশক্তিতে রূপান্তরের এক সুসংহত রূপরেখা উপস্থাপন করেন।
তিনি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের বিকাশ-অভিযাত্রায় এটি একটি নির্ণায়ক মুহূর্ত। দীর্ঘদিনের নাগরিক পরিকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতাগুলির মোকাবিলা করে আমরা রাজ্যের জন্য একটি সুস্পষ্ট উন্নয়ন-মানচিত্র নির্মাণে অগ্রসর হচ্ছি। আমাদের অভিমুখ হল আপসহীন গুণমান, দ্রুত ও নির্বিঘ্ন বাস্তবায়ন এবং অনিরাপদ নির্মাণের ক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতা। আমার অভিপ্রায় হল আমাদের নগরগুলিকে এমন গতিশীল অর্থনৈতিক ইঞ্জিনে রূপান্তরিত করা, যা নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং সুস্থিতিশীল বিকাশকে ত্বরান্বিত করবে।”
প্রশাসনিক জটিলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতা অপসারণ এবং নগরোন্নয়নের পরিকাঠামোকে আধুনিকীকরণের বিষয়ে সরকারের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে শ্রীমতী পাল সমন্বিত নাগরিক পরিকাঠামো, সমকালীন প্রকৌশল-পদ্ধতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক ব্যবস্থার অপরিহার্যতার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।
তিনি জানান, রাজ্য সরকার সমন্বিত নাগরিক পরিষেবা-ব্যবস্থা ও আধুনিক পরিকাঠামোয় বিনিয়োগ করছে। একই সঙ্গে কাঠামোগত দৃঢ়তা সুনিশ্চিত করা, শক্তি-দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দুর্যোগ-সহনশীল নগরসমষ্টির বিকাশে প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ভবন-নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব দূরীকরণ, প্রক্রিয়াগত সরলীকরণ এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধির প্রতিও তিনি সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, “কাঠামোগত শৃঙ্খলা ব্যতিরেকে সুস্থিতিশীল উন্নয়ন সম্ভব নয় এবং ভবন-নির্মাণ বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কোনওরকম আপস করা হবে না।”
রাজ্যের ভবিষ্যৎ নগর-ভূদৃশ্যের রূপরেখা তুলে ধরে শ্রীমতী পাল ঘোষণা করেন, “আগামী দিনের বাংলার নগর-দিগন্ত নির্মিত হতে হবে আপসহীন আস্থা, নিরাপত্তা এবং গুণমানের ভিত্তির উপর।” তিনি প্রস্তাবিত একাধিক কৌশলগত পরিকাঠামো প্রকল্পের কথাও তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে রিং রোড, বাইপাস ধাবা থেকে রাজারহাট পর্যন্ত এলিভেটেড করিডর এবং চারটি স্মার্ট সিটির উন্নয়ন।
পশ্চিমবঙ্গ হাউজিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর তথা IAS আধিকারিক শ্রী বিভু গোয়েল কলকাতাকে বিনিয়োগ, সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে সরকারের অভিপ্রায় তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “কলকাতাকে অংশীদারিত্ব ও বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হল জমির প্রাপ্যতা এবং তা মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। সরকার আরও সহযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করছে। সামাজিক পরিমণ্ডল এবং ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলকে একসঙ্গেই বিকশিত হতে হবে।”
আরও সক্ষম ও বিনিয়োগবান্ধব নিয়ন্ত্রক পরিমণ্ডলের আহ্বান জানিয়ে CII Eastern Region-এর প্রাক্তন চেয়ারম্যান, CII SNCEL-এর চেয়ারম্যান এবং Ambuja Neotia Group-এর চেয়ারম্যান শ্রী হর্ষবর্ধন নেওটিয়া দ্রুততর বিধিবদ্ধ অনুমোদন এবং পরিকাঠামোগত সম্প্রসারণকে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ত্বরান্বিত করার অপরিহার্য পূর্বশর্ত হিসেবে চিহ্নিত করেন।
তিনি বলেন, “সরকারের কাছে আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে প্রগতিশীল নীতির প্রয়োজন। অনুমোদনের দ্রুততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেট্রো করিডরগুলির প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ শহরের উপর বিপুল ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আমাদের দুটি প্রধান প্রত্যাশা হল নিয়ন্ত্রক সহায়তা এবং পরিকাঠামো উন্নয়ন। এর পরবর্তী দায়িত্ব ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক সংস্থাগুলি নিজেদের উদ্যোগেই এগিয়ে নিতে পারে।”
শ্রী নেওটিয়া আরও পথচারীবান্ধব, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সুস্থিতিশীল নগর-পরিকল্পনার পক্ষে মত প্রকাশ করেন এবং কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে অধিকতর সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন। বিদ্যমান বিমান পরিকাঠামো সম্পৃক্ততার সীমায় পৌঁছনোর পূর্বেই একটি অতিরিক্ত বিমানবন্দরের সম্ভাব্য প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি আসন্ন ভূমি ও শিল্পনীতি ঘিরে শিল্পমহলের প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরেন।
CII Eastern Region-এর চেয়ারম্যান এবং Tega Industries Ltd-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর তথা গ্রুপ CEO শ্রী মেহুল মোহাঙ্কা ভারতের সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে আবাসন শিল্পের কৌশলগত গুরুত্বের উপর আলোকপাত করেন।
তিনি বলেন, “ভারতের রিয়েল এস্টেট ক্ষেত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে এবং রাজস্ব উৎপাদনে এর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একই সঙ্গে এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কর্মসংস্থান-সৃষ্টিকারী ক্ষেত্র। এই ক্ষেত্রের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সুস্থিতিশীল উন্নয়নের অপরিহার্যতার প্রতিও সজাগ থাকতে হবে।”
দ্রুততর নির্মাণকার্যের পরিবেশগত অভিঘাতও আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। IGBC Kolkata-এর চেয়ারম্যান এবং The Salient-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রিন্সিপাল শ্রী বিবেক সিং রাঠোর নির্মাণশিল্পের বিপুল সম্পদ-নির্ভর চরিত্রের কথা উল্লেখ করে বলেন, সুস্থিতিশীলতাকে পার্শ্ববর্তী বিবেচনা হিসেবে নয়, বরং নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়নের অন্তর্নিহিত অবিচ্ছেদ্য উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
তিনি বলেন, “নির্মাণশিল্প একটি সম্পদ-নিবিড় ক্ষেত্র এবং পরিবেশের উপর এর অভিঘাত সম্পর্কে আমাদের সজাগ থাকা আবশ্যক। অতএব, আমরা কীভাবে আমাদের নগরগুলির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন করব, তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হতে হবে সুস্থিতিশীল নির্মাণ-পদ্ধতি।”
অন্যদিকে Windamere Projects-এর Founding Partner শ্রী হেমন্ত লোধা কলকাতাকে আবেগঘনভাবে “দেশের রত্ন” হিসেবে অভিহিত করেন। Sureka Group-এর চেয়ারম্যান শ্রী প্রদীপ সুরেকা বলেন, মহানগরীর মধ্যে বিকাশের প্রবল আকাঙ্ক্ষা রয়েছে এবং সেই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকাঠামোগত সম্প্রসারণ অপরিহার্য।
উদ্বোধনী দিনে পূর্ব ভারতের নির্মিত-পরিবেশকে রূপান্তরিতকারী বিভিন্ন শক্তি নিয়ে একাধিক বিষয়ভিত্তিক অধিবেশনও অনুষ্ঠিত হয়। সমন্বিত টাউনশিপ ও রিয়েল এস্টেটের পরবর্তী বিবর্তন, সবুজ ও Net-Zero ভবনের দিকে উত্তরণ, আবাসন ও নির্মাণক্ষেত্রে উদীয়মান প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন এবং বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে জনপরিকাঠামোর অনুঘটক ভূমিকা—বহুবিধ বিষয় আলোচনায় উঠে আসে।
এই বহুমাত্রিক মতবিনিময় নির্মাতা, স্থপতি, প্রযুক্তিবিদ, পরিকাঠামো-নেতৃত্ব এবং শিল্পক্ষেত্রের বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির আদান-প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করে। বিশেষত সুস্থিতিশীল, বুদ্ধিদীপ্ত, স্থিতিস্থাপক এবং ভবিষ্যৎ-উপযোগী নগর-পরিবেশ নির্মাণের জন্য বাস্তবায়নযোগ্য কাঠামোর উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
নীতি, উদ্যোগ, প্রযুক্তি এবং পরিকাঠামোর সম্মিলিত সমন্বয়ে CII Realty East 2026 & Build Expo 2026 পূর্ব ভারতের নির্মিত-পরিবেশকে কেন্দ্র করে উন্নয়ন-ভাবনাকে পুনর্নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে।
Build Expo 2026 আগামী ২১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত নিউ টাউনের বিশ্ব বাংলা এক্সিবিশন সেন্টারে চলবে। প্রদর্শনীতে সমকালীন নির্মিত-পরিবেশের রূপান্তর সাধনের লক্ষ্যে বিস্তৃত পরিসরের পণ্য, প্রযুক্তি, প্রকৌশল-সমাধান এবং অভিনব উদ্ভাবন প্রদর্শিত হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *