শ্রীমতী শেলি ঘোষ: সুপ্রতীক শ্যামল ঘোষ এবং ‘অ্যালাইভ ইন্ডিয়া’-র নির্মাণের নেপথ্যের নীরব শক্তি

সুপ্রতীক শ্যামল ঘোষের শিল্পীজীবন থেকে ‘অ্যালাইভ ইন্ডিয়া’ নির্মাণ—নেপথ্যে ছিলেন মা শ্রীমতী শেলি ঘোষ

কলকাতা, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬: কিছু বিদায় কোনও শব্দ করে আসে না। একটি পরিচিত চেয়ার হঠাৎ শূন্য হয়ে যায়, ঘরের স্বাভাবিক কোলাহল স্তব্ধ হয়ে আসে, আর অবচেতনেই মুখ থেকে উচ্চারিত হয়—‘মা’। তারপরই উপলব্ধি হয়, যে কণ্ঠস্বর এতদিন সেই ডাকের উত্তর দিয়েছে, তা আর ফিরে আসবে না।
ভারতীয় গায়ক-গীতিকার, সুরকার, মঞ্চশিল্পী ও সংগীতনির্ভর গণমাধ্যম উদ্যোগপতি সুপ্রতীক শ্যামল ঘোষের কাছে তাঁর মা শ্রীমতী শেলি ঘোষের প্রয়াণ তাই কেবল একজন অভিভাবককে হারানোর ঘটনা নয়। এটি এমন এক নারীর বিদায়, যিনি তাঁর জীবনের দৃশ্যমান সাফল্যের প্রায় প্রতিটি অধ্যায়ের অন্তরালে নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
অনেক আগে, যখন ছিল না ‘Aurko – The Rising Sun’, ছিল না ‘Alive India’, ছিল না সংস্থা, অনুষ্ঠান, স্টুডিও, শিল্পী, দর্শক কিংবা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি—ছিল পরিবারের আদরের, লাজুক এক ছেলে, ‘বাবিন’। আর ছিলেন এমন এক মা, যিনি সেই ছেলেকে স্বপ্ন দেখার মতো নিরাপত্তা দিয়েছিলেন।
শিল্পের আবহে বেড়ে ওঠা, তারপর অকালবিয়োগ
কলকাতায় শিল্প-সংস্কৃতির আবহে বেড়ে ওঠেন সুপ্রতীক। চলচ্চিত্র, থিয়েটার, রেডিও ও সংগীতের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক যোগ ছিল নিবিড়। তাঁর প্রয়াত পিতা শ্রী শ্যামল ঘোষ চলচ্চিত্র ও থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সুপ্রতীক তাঁর পিতার ভারতীয় চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছেন; সংরক্ষিত চলচ্চিত্র-তথ্যেও হিন্দি ও বাংলা চলচ্চিত্রে শ্যামল ঘোষের কাজের উল্লেখ পাওয়া যায়।
কিন্তু শিল্পময় সেই উত্তরাধিকারের সঙ্গে এসেছিল এক গভীর ব্যক্তিগত বিচ্ছেদ। কৈশোরেই পিতাকে হারান সুপ্রতীক।
যে বয়সে একজন তরুণ নিজের পরিচয় খুঁজতে শুরু করে, সেই বয়সেই তাঁকে মুখোমুখি হতে হয়েছিল এমন এক শোকের, যা একটি জীবনকে ‘আগে’ ও ‘পরে’—এই দুই পর্বে বিভক্ত করে দিতে পারে।
সেই সময় থেকে শ্রীমতী শেলি ঘোষ কেবল একজন মা ছিলেন না। তিনি হয়ে উঠেছিলেন পরিবার, নিরাপত্তা, ধারাবাহিকতা এবং অবিচল আশ্রয়ের প্রতীক।
যে মানুষটি থেকে গিয়েছিলেন, সময়ের সঙ্গে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন সেই মানুষ, যাঁর থেকে যাওয়াই তাঁর ছেলেকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অবকাশ দিয়েছিল।
তিনি মাটিকে শক্ত করে রেখেছিলেন, যাতে ছেলে আকাশে উড়তে পারে
সৃজনশীল পেশার কাহিনি সাধারণত সাফল্যের পর পিছন ফিরে লেখা হয়। সেখানে থাকে মঞ্চ, মাইলফলক, স্বীকৃতি, পুরস্কার এবং সংখ্যার বিবরণ। কিন্তু সেই ইতিহাসে প্রায়শই অনুল্লেখিত থেকে যান সেই মানুষগুলি, যাঁরা সাফল্যের পূর্ববর্তী অনিশ্চয়তাগুলি নিজেদের অন্তরে ধারণ করেছিলেন।
যে মা রাত জেগে অপেক্ষা করেছেন, ঘরকে সচল রেখেছেন, সন্তান দূরযাত্রায় বেরোলে উদ্বেগ নিজের মধ্যে চেপে রেখেছেন এবং জানতেন—প্রচলিত জীবন হয়তো নিরাপদ, কিন্তু সেই নিরাপত্তা সন্তানের স্বপ্নের বিনিময়ে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
সুপ্রতীকের ক্ষেত্রে সেই মানুষটি ছিলেন তাঁর মা, শ্রীমতী শেলি ঘোষ।
তিনি নিজের আরাম ও নিরাপত্তার চেয়ে ছেলের সম্ভাবনাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। ছেলে যাতে দূরে যেতে পারেন, নতুন কিছু নির্মাণ করতে পারেন, ঝুঁকি নিতে পারেন—তার জন্য তিনি ঘরের নিশ্চয়তাটুকু অটুট রেখেছিলেন।
কিছু বিনিয়োগের হিসাব থাকে। কিছু বিনিয়োগের মালিকানার নথি থাকে। সাফল্যের স্বীকৃতির জন্য থাকে পুরস্কার।
কিন্তু একজন শিল্পী বা উদ্যোক্তার জীবনের কিছু গভীরতম বিনিয়োগ কোনও হিসাবের খাতায় লেখা থাকে না।
সেগুলি করেন এমন মানুষ, যাঁরা কোনও অংশীদারিত্ব, পদমর্যাদা, করতালি কিংবা প্রতিদান চান না। তাঁরা শুধু চান, যাকে ভালোবাসেন সে যেন তার সম্ভাবনার পূর্ণতায় পৌঁছতে পারে।
সুপ্রতীক ঘোষের জীবনে তাঁর মা ছিলেন সেই স্বপ্নের প্রথম বিনিয়োগকারী।
‘বাবিন’ থেকে সুপ্রতীক: একটি ব্যান্ড থেকে বৃহত্তর নির্মাণ
এই স্বপ্ন একরাত্রিতে বাস্তবায়িত হয়নি। বহু বছরের চাকরি, পরিবেশন, প্রত্যাখ্যান, অধ্যবসায়, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে তার বিস্তার ঘটেছে। আর সেই যাত্রার কেন্দ্রে ছিল সংগীত।
২০০০ সালে সুপ্রতীক প্রতিষ্ঠা করেন ‘Aurko – The Rising Sun’। শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ মঞ্চসংগীত-যাত্রা, যা পরবর্তীকালে ভারত ও আন্তর্জাতিক পরিসরে অসংখ্য শহরে বিস্তৃত হয়।
ক্রমে শিল্পী হিসেবে তিনি উপলব্ধি করেন, একটি অনুষ্ঠান কেবল মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা একজন শিল্পীকে দিয়ে নির্মিত হয় না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকেন সংগীতশিল্পী, প্রযুক্তিবিদ, প্রযোজক, শব্দপ্রকৌশলী, মঞ্চকর্মী, ব্যবস্থাপক, গণমাধ্যমকর্মী, ব্র্যান্ড, অনুষ্ঠানস্থল এবং আরও অসংখ্য মানুষ।
এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে বৃহত্তর এক ভাবনার ভিত্তি নির্মাণ করে।
২০১০ সালে ‘Alive Media Productions and Entertainment Private Limited’ এবং ‘Alive Outdoor Services Private Limited’-এর মাধ্যমে উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁর পরিসর আরও বিস্তৃত হয়।
পরবর্তীকালে ‘Alive India’ একটি বৃহত্তর শিল্পী-নির্ভর পরিসর হিসেবে বিকশিত হয়, যেখানে সংগীত, গণমাধ্যম, প্রত্যক্ষ অনুষ্ঠান, স্রষ্টা, ব্র্যান্ড এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের প্রয়াস দেখা যায়।
বছরের পর বছর ধরে এই পরিসরের মধ্যে প্রত্যক্ষ সংগীতানুষ্ঠান, স্টুডিও, শিল্পী-বিকাশ, মৌলিক সংগীত, বিষয়বস্তু নির্মাণ, সাংস্কৃতিক উদ্যোগ এবং সামাজিক প্রভাবসৃষ্টিকারী বিভিন্ন কর্মসূচির বিকাশ ঘটে।
সরলরৈখিকভাবে যাত্রাটিকে লিখলে দাঁড়ায়—
সুপ্রতীক → Aurko Live → Alive → Alive India
কিন্তু মানুষের জীবন কখনও এত সরলরৈখিক নয়।
প্রতিটি তীরচিহ্নের পেছনে ছিল বহু বছর। সেই বহু বছরের পেছনে ছিল অনিশ্চয়তা। আর সেই অনিশ্চয়তার একটি বড় অংশের অন্তরালে ছিলেন এমন এক মা, যিনি ঘরকে নিশ্চিততার আশ্রয় করে রেখেছিলেন।
উচ্চাকাঙ্ক্ষার নেপথ্যের অদৃশ্য পরিকাঠামো
উদ্যোক্তাদের ঝুঁকি নেওয়ার জন্য আমরা তাঁদের সাফল্যের কথা বলি। কিন্তু খুব কম সময়ই প্রশ্ন করি—সেই ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল কে?
অনেক শিল্পী, উদ্যোক্তা ও নেতৃত্বদাতার পেছনে থাকে আবেগের শ্রমে নির্মিত এক অদৃশ্য পরিকাঠামো—অভিভাবক, জীবনসঙ্গী, পরিবার কিংবা পরামর্শদাতা।
তাঁরা ব্যবসায়িক উপস্থাপনায় থাকেন না। তাঁদের ত্যাগের কোনও পরিমাপ থাকে না। একজন মায়ের নির্ঘুম রাতের কোনও হিসাব নেই। অপেক্ষার কোনও মূল্যায়ন নেই।
তবুও উচ্চাকাঙ্ক্ষা খুব কম ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ একা বেড়ে ওঠে।
এই কারণেই শ্রীমতী শেলি ঘোষের কাহিনি শুধু একজন মা ও তাঁর ছেলের কাহিনি নয়। এটি ভারতের অসংখ্য পরিবারের এক নীরব বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি—যেখানে একজনের দৃশ্যমান যাত্রা সম্ভব হয় অন্য কারও প্রায় অদৃশ্য ত্যাগের কারণে।
অনেকের জীবনেই কোথাও না কোথাও এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি নীরবে বলেছিলেন—
‘তুমি যাও। আমি আছি।’
ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে নির্মাণ
‘Aurko’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ২০০০ সালে। তার এক দশক পরে আসে ‘Alive India’।
২০২৬ সালে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে সুপ্রতীকের যাত্রায় ‘Aurko’-র মঞ্চপরিবেশনের সংখ্যা ২,৭০০-রও বেশি এবং তা ৭০টিরও বেশি শহরে বিস্তৃত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সময়ে ‘Alive India’ সংগীত, গণমাধ্যম, প্রত্যক্ষ অনুষ্ঠান ও স্রষ্টাদের সংযোগস্থলে একটি বৃহত্তর পরিসর হিসেবে বিকশিত হয়েছে।
তবে এই বিবর্তনের তাৎপর্য শুধুমাত্র সংখ্যায় নয়। এটি একটি দর্শনেরও বিবর্তন।
কোনও এক সময় ব্যক্তিগত শিল্পীর উচ্চাকাঙ্ক্ষা রূপান্তরিত হতে শুরু করে অন্য শিল্পীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টির প্রশ্নে।
“I became US. ME became WE.”
মঞ্চ হয়ে ওঠে একটি পরিসর। পরিবেশন হয়ে ওঠে উদ্যোগ। আর উদ্যোগ ক্রমশ যুক্ত হয় এমন এক ধারণার সঙ্গে, যেখানে সংগীত শুধু করতালির নয়, সুযোগ ও জীবিকারও পথ নির্মাণ করতে পারে।
এই ভাবনাই পরবর্তীকালে এমন একটি বাক্যে প্রকাশ পায়, যা ‘Alive India’-র যাত্রার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত—
“Changing Lives Through Music.”
সম্পর্ক থেকে বিচ্ছেদ
শ্রীমতী শেলি ঘোষের প্রয়াণ বহু দশকের পুরনো সম্পর্কের সমীকরণটিকে যেন উল্টে দিয়েছে।
জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি থেকে গিয়েছিলেন, যাতে তাঁর ছেলে উড়তে পারেন।
এখন সেই ছেলে থেকে যাবেন, আর মা চলে যাবেন।
এই উল্টো হয়ে যাওয়া সম্পর্কই হয়তো সেই ভাবনাটিকে আরও গভীর করে তোলে—
“DETACHMENT IN ATTACHMENT” — আসক্তির মধ্যেই অনাসক্তি।
হয়তো অনাসক্তি ভালোবাসার অনুপস্থিতি নয়। হয়তো এটি ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন প্রকাশগুলির একটি।
যে মানুষটি সারাজীবন আপনার হাত ধরে রেখেছিলেন, একসময় তিনি সেই হাত ছেড়ে দেন। আর ভালোবাসা তখন শেখায়—সেই হাত আর টেনে ধরে রাখা যাবে না।
ভালোবাসার অর্থ কাউকে চিরকাল নিজের কাছে আটকে রাখা নয়। ভালোবাসার অর্থ ছিল পাশে থাকা। যতদিন পথ একসঙ্গে চলার সুযোগ ছিল, ততদিন পাশাপাশি হাঁটা।
তারপর পথের প্রান্তে দাঁড়িয়ে সাহস করে অন্যজনকে এগিয়ে যেতে দেওয়া—যেখানে আমরা আর অনুসরণ করতে পারি না।
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নিদ্রা
শ্রীমতী শেলি ঘোষের ঘনিষ্ঠজনেরা তাঁকে এমন এক নারী হিসেবে স্মরণ করেন, যিনি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে সচল রাখার আপাত-সাধারণ অথচ অপরিহার্য দায়িত্বগুলিতে সর্বদা ব্যস্ত থাকতেন।
রান্না। যত্ন। দেওয়া। উদ্বেগ। ব্যাংক ও সংসারের দায়িত্ব সামলানো। ঘর গোছানো। প্রিয়জনদের ফিরে আসার অপেক্ষা করা। দরজা পরীক্ষা করা। অন্য সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পরও জেগে থাকা।
মায়েরা এই কাজগুলি এত স্বাভাবিকভাবে করেন বলেই সেগুলি ছোট বলে মনে হয়।
কিন্তু তাঁদের অনুপস্থিতিতেই অনেক সময় সেই কাজগুলির প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়।
হয়তো যে চোখগুলি সারাজীবন অন্য সবার দিকে নজর রেখেছে, অবশেষে সেই চোখ দুটি এমন এক দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নিদ্রায় বন্ধ হয়েছে, যা দৈনন্দিন জীবন তাঁকে কখনও সম্পূর্ণভাবে উপভোগ করতে দেয়নি।
আর কোনও রান্নার সময়সীমা নেই।
কোনও ব্যাংকের দায়িত্ব নেই।
কোনও অসমাপ্ত সংসারের কাজ নেই।
ঘরকে নিখুঁত রাখার কোনও দায় নেই।
দরজা পরীক্ষা করার প্রয়োজন নেই।
কারও জন্য অপেক্ষা করে জেগে থাকার প্রয়োজন নেই।
আর কোথাও ছুটে যাওয়ারও প্রয়োজন নেই।
শুধু বিশ্রাম নিন, মা।
ব্যবসায়িক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যে নেতৃত্বের শিক্ষা খুব কমই দেয়
উদ্যোক্তা-জীবন আমাদের শেখায়—অর্জন করতে, গড়ে তুলতে, রক্ষা করতে, বিস্তার করতে, অটল থাকতে।
নেতৃত্বের অধিকাংশ আলোচনাই এগিয়ে যাওয়ার ভাষায় নির্মিত—
থামবে না।
হাল ছাড়বে না।
গড়ে যেতে থাকো।
লড়াই চালিয়ে যাও।
কিন্তু জীবন শেষ পর্যন্ত অন্য একটি শিক্ষা সামনে এনে দেয়।
কিছু মানুষ, কিছু মুহূর্ত এবং কিছু অধ্যায় এমন থাকে, যেগুলিকে কোনও প্রভাব, সম্পদ, কৌশল বা দৃঢ়তা দিয়ে চিরস্থায়ী করা যায় না।
শোকের কোনও ব্যবসায়িক সমাধান নেই। তাকে পার হয়ে যেতে হয়, গ্রহণ করতে হয়, স্মরণ করতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত অন্যভাবে বয়ে নিয়ে চলতে হয়।
হয়তো পরিণত হওয়ার একটি মাপকাঠি হল এমন কিছু শেখা, যার জন্য নেতৃত্ব আমাদের খুব কমই প্রস্তুত করে—
ভালোবাসাকে ছেড়ে না দিয়ে কীভাবে কাউকে ছেড়ে দিতে হয়।
শ্রীমতী শেলি ঘোষের প্রয়াণ শুধু শোক রেখে যায়নি। এটি দৃশ্যমান সাফল্যের কাহিনির অন্তরালে থাকা একটি সত্যকে সামনে এনেছে।
কোনও সংস্থা কে গড়ে তুলেছেন, তা জানার আগে কখনও কখনও প্রশ্ন করা উচিত—
যিনি সংস্থাটি গড়ে তুলেছেন, সেই মানুষটিকে গড়ে তুলেছিলেন কে?
সুপ্রতীক শ্যামল ঘোষ এবং শেষ পর্যন্ত ‘Alive India’-তে পরিণত হওয়া তাঁর যাত্রার ক্ষেত্রে সেই উত্তরের একটি নাম রয়েছে—
শ্রীমতী শেলি ঘোষ।
একজন মায়ের সাফল্য শুধু তাঁর সন্তানের সাফল্যে মাপা যায় না
এখানে আরও একটি পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন।
শ্রীমতী শেলি ঘোষের জীবনকে শুধুমাত্র তাঁর ছেলের পরবর্তী সাফল্যের মাপকাঠিতে বিচার করা উচিত নয়। একজন মায়ের মূল্য তাঁর সন্তানের কর্মজীবনের ব্যাপ্তি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।
তাঁর অবদান ছিল হাজার হাজার ছোট ছোট মুহূর্তে, যেগুলির সঙ্গে ব্যবসা, ব্র্যান্ড, মঞ্চ কিংবা স্বীকৃতির কোনও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল না।
প্রস্তুত রাখা একটি খাবার।
জ্বালিয়ে রাখা একটি আলো।
উদ্বিগ্ন একটি ফোন।
রাতে দেরিতে খোলা একটি দরজা।
ব্যর্থতার পর যেমন সহজে ফিরে আসা যায়, সাফল্যের পরও তেমনই ফিরে আসা যায়—এমন একটি বাড়ি।
এই বিষয়গুলি সাধারণত সংবাদশিরোনাম হয় না।
তবুও এগুলিই প্রায়শই সেই আবেগের স্থাপত্য নির্মাণ করে, যার ওপর একটি জীবন গড়ে ওঠে।
আর হয়তো সেই কারণেই মাকে হারানোর মুহূর্তে একজন সফল প্রাপ্তবয়স্ক মানুষও কিছুক্ষণের জন্য ফিরে যান সেই শিশুটির কাছে, যিনি একদিন ছিলেন।
প্রতিষ্ঠাতা নন।
গায়ক নন।
উদ্যোক্তা নন।
শুধু—
বাবিন।
যে খুঁজছে তার মাকে।
১ অক্টোবর কলকাতায় শ্রদ্ধা অর্পণ
আগামী বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সুপ্রতীক শ্যামল ঘোষ ও তাঁর পরিবার প্রয়াত শ্রীমতী শেলি ঘোষের স্মৃতিতে শ্রদ্ধা অর্পণ করবেন।
স্থান:
মালিক গেস্ট হাউস
৩৯এ, হরিশ মুখার্জি রোড
ভবানীপুর, কলকাতা – ৭০০০২৫
পরিবারের পক্ষ থেকে আত্মীয়, বন্ধু, শিল্পী, সহকর্মী, সহযোগী, অংশীদার এবং শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে—যাঁরা ফোন করেছেন, দেখা করেছেন, বার্তা পাঠিয়েছেন, প্রার্থনা করেছেন অথবা নীরবে ‘মা’-কে স্মরণ করেছেন।
যাঁরা শহর, দেশ, মহাদেশ কিংবা পরিস্থিতির কারণে দূরে রয়েছেন, তাঁদের জন্য সুপ্রতীকের অনুরোধ সরল—
উপস্থিতিকে শুধু কিলোমিটারের দূরত্ব দিয়ে মাপবেন না।
১ অক্টোবর যেখানেই থাকুন না কেন, একটি নীরব মুহূর্তই যথেষ্ট।
একটি প্রার্থনা।
একটি ভাবনা।
একটি স্মরণ।
বড় কোনও শব্দের প্রয়োজন নেই।
শুধু এমন এক মায়ের জন্য একটি মুহূর্ত, যিনি জীবনের দীর্ঘ সময় অন্য একজনকে নিজের ডানা মেলতে সাহায্য করেছেন।
কারণ যারা আমাদের ডানা মেলতে সাহায্য করেন, তাঁরা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যান না।
তাঁরা হয়ে ওঠেন সেই কারণের অংশ, যার জন্য আমরা উড়ে চলি।
“অনাসক্তি আসক্তির অনুপস্থিতি নয়।
হয়তো অনাসক্তি হল সেই আসক্তি, যা শেষ পর্যন্ত অন্যজনকে মুক্ত করে দিতে শিখেছে।”
স্মরণে
শ্রীমতী শেলি ঘোষ — মা
সুপ্রতীক শ্যামল ঘোষের নেপথ্যের নীরব শক্তি এবং সেই ব্যক্তিগত যাত্রার অন্তরালের মানুষ, যা পরবর্তীকালে ‘Aurko’ ও ‘Alive India’-তে পরিণত হয়েছে।
শ্রদ্ধা অর্পণ: বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬
সময়: সকাল ১০টা–বিকেল ৪টা
স্থান: মালিক গেস্ট হাউস, ৩৯এ হরিশ মুখার্জি রোড, ভবানীপুর, কলকাতা – ৭০০০২৫
সুপ্রতীক শ্যামল ঘোষ সম্পর্কে
সুপ্রতীক শ্যামল ঘোষ একজন ভারতীয় গায়ক-গীতিকার, সুরকার, মঞ্চশিল্পী এবং সংগীতনির্ভর গণমাধ্যম উদ্যোগপতি।
২০০০ সালে তিনি ‘Aurko – The Rising Sun’ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে তিনি ‘Alive India’-কে একটি শিল্পী-নির্ভর সংগীত, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক পরিসর হিসেবে গড়ে তোলেন, যেখানে সরাসরি সংগীত, স্রষ্টা, স্টুডিও, বিষয়বস্তু, ব্র্যান্ড এবং সামাজিক প্রভাবসৃষ্টিকারী উদ্যোগ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
সাম্প্রতিক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ‘Aurko’-র যাত্রা ভারত ও আন্তর্জাতিক পরিসরে ২,৭০০-রও বেশি অনুষ্ঠান এবং ৭০টিরও বেশি শহরে বিস্তৃত। সুপ্রতীক ভারতীয় পারফর্মিং রাইট সোসাইটির কাছেও সুরকার ও গীতিকার হিসেবে নিবন্ধিত।
তাঁর কাজ ক্রমশ এমন এক দর্শনের দিকে অগ্রসর হয়েছে, যেখানে সংগীতকে সুযোগ, জীবিকা এবং সামাজিক প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত করার ভাবনা রয়েছে—
“Changing Lives Through Music.”
Alive India সম্পর্কে
‘Alive India’ হল সুপ্রতীক শ্যামল ঘোষ প্রতিষ্ঠিত একটি শিল্পী-নির্ভর সংগীত, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক পরিসর, যার বিকাশ বেঙ্গালুরু থেকে শুরু হয়েছে।
এর বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে সরাসরি সংগীতানুষ্ঠান, মৌলিক সংগীত, স্টুডিও পরিকাঠামো, শিল্পী-বিকাশ, ব্র্যান্ড-নির্ভর বিনোদন, স্রষ্টাদের সহযোগিতা এবং সামাজিক প্রভাবসৃষ্টিকারী বিভিন্ন কর্মসূচি।
এর বিভিন্ন মঞ্চ ও উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে Alive India In Concert, Alive India Studio, Alive India Rockstars এবং Alive India Music Foundation, পাশাপাশি আরও বিভিন্ন সংগীত ও সাংস্কৃতিক মেধাস্বত্ব।
এর মূল দর্শন—
Changing Lives Through Music | Sing to Save | Play for a Cause
পূর্বপ্রকাশিত প্রতিবেদন
সুপ্রতীক শ্যামল ঘোষ, ‘Aurko’, ‘Alive India’ এবং ২০২৬ সালে তাঁর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সংক্রান্ত এআইএমএ-র পূর্বপ্রকাশিত প্রতিবেদনগুলি এই প্রতিবেদনের সঙ্গে অন্তর্লিঙ্ক হিসেবে যুক্ত করা হলো, যাতে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলির মধ্যে একটি সুসংবদ্ধ পাঠ-সংযোগ তৈরি হয়।

লিংক: https://hellokolkata.co.in/2026/08/29/supratiek-shyamal-ghosh-receives-26th-mother-teresa-international-award-in-singapore-transforming-a-26-year-musical-odyssey-into-a-mission-of-opportunity/

ছবির বিবরণ
ছবি ১: শ্রীমতী শেলি ঘোষ।
ছবি ২: “তাঁর পুত্র সুপ্রতীক শ্যামল ঘোষের সঙ্গে শ্রীমতী শেলি ঘোষ, ‘অ্যালাইভ ইন্ডিয়া’-র প্রতিষ্ঠাতা।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *