ঋদ্ধি ভট্টাচার্য, দম দম: ঐতিহ্য, ভক্তি ও সৃজনশীলতার মেলবন্ধনে এবার ৬৫তম বর্ষে পদার্পণ করল ক্রস রোড অধিবাসীবৃন্দের শ্যামাপুজো। দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারাকে বহন করে চলেছে এই পুজো। এবছর পুজোর মূল আকর্ষণ অভিনব ভাবনা ও দর্শননির্ভর থিম ‘বিরাজমান’। মা কালীর সর্বব্যাপী উপস্থিতি এবং মানবজীবন তথা সমগ্র জগৎজুড়ে তাঁর প্রভাবকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে এবারের পুজোর মূল ভাবনা। পুজো উদ্যোক্তা -দের ভাবনায়, দেবী কালী কেবল মন্দিরের প্রতিমা কিংবা নির্দিষ্ট কোনও উপাসনাস্থলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নন। তিনি বিরাজ করেন সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে, প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানে, জীবনের প্রতিটি স্পন্দনে। মানুষের সুখ-দুঃখ, সৃষ্টি ও ধ্বংস, শক্তি ও সাহস, অন্ধকার ও আলোর প্রতিটি পরতে রয়েছে তাঁর অস্তিত্বের অনুভব। দৃশ্যমান জগৎ থেকে শুরু করে মানুষের অন্তরের গভীরতম অনুভূতি—সবেতেই কোনও না কোনওভাবে মায়ের শক্তি ও প্রভাব বিদ্যমান। সেই সর্বব্যাপী মাতৃশক্তির উপস্থিতিকেই ‘বিরাজমান’ শীর্ষক ভাবনার মধ্য দিয়ে তুলে ধরার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। এই থিমের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের সামনে একটি গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধি তুলে ধরতে চেয়েছেন উদ্যোক্তারা। মা কালী শুধু শক্তির আরাধ্য দেবী নন, তিনি সময়, পরিবর্তন, সৃষ্টি ও বিনাশেরও প্রতীক। জীবনের প্রতিটি পরিবর্তনের মধ্যেই তাঁর শক্তির প্রকাশ ঘটে। অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভশক্তির প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি মানবসমাজকে নতুন পথের দিশা দেখান। তাই তাঁর বিরাজমান উপস্থিতি কোনও নির্দিষ্ট স্থান, সময় কিংবা পরিসরের মধ্যে আবদ্ধ নয়। বরং সমগ্র সৃষ্টির মধ্যেই তাঁর অস্তিত্ব অনুভূত হয়। এই দর্শনকেই শিল্পভাবনা ও উপস্থাপনার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এবারের পুজোর অন্যতম উদ্দেশ্য। পুজোর এই বিশেষ ভাবনার নেপথ্যে রয়েছেন কৌশিক হরি। তাঁর পরিকল্পনা ও চিন্তাভাবনাকে কেন্দ্র করেই ‘বিরাজমান’ থিমের মূল দর্শন গড়ে উঠেছে। ধর্মীয় আবেগের পাশাপাশি দর্শন ও সৃজনশীলতার মেলবন্ধনে এবারের আয়োজন দর্শনার্থীদের মনে বিশেষ ছাপ ফেলবে বলেই আশাবাদী পুজো উদ্যোক্তারা। পুজোর প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন অনির্বান সমাজপতি। সভাপতি পদে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন রিনা ঘোষদস্তিদার ও সীমা ঘোষ। তাঁদের নেতৃত্ব ও সহযোগিতায় ৬৫তম বর্ষের এই শ্যামাপুজোকে স্মরণীয় করে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন ক্রস রোড অধিবাসীবৃন্দের সদস্যরা। দীর্ঘ ৬৫ বছরের পথচলায় এই পুজো শুধু ধর্মীয় উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এলাকার মানুষের মিলনক্ষেত্র ও সামাজিক সম্প্রীতির অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় মানুষের আবেগ, ভালোবাসা ও ঐতিহ্য। এবারের ‘বিরাজমান’ থিম সেই ঐতিহ্যের ধারাকে বজায় রেখেই নতুন ভাবনার এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করতে চলেছে।সব মিলিয়ে, ক্রস রোড অধিবাসীবৃন্দের ৬৫তম বর্ষের শ্যামাপুজোয় ‘বিরাজমান’ কেবল একটি থিম নয়, বরং দেবী কালীর সর্বব্যাপী শক্তি ও অস্তিত্বকে নতুনভাবে উপলব্ধি করার এক আন্তরিক প্রয়াস। ভক্তি, দর্শন ও শিল্পের সমন্বয়ে এবারের পুজো দর্শনার্থীদের কাছে এক বিশেষ অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে, এমনটাই প্রত্যাশা উদ্যোক্তাদের।



