হাট থেকে মল, ঐতিহ্যের ‘যাত্রা’! সাউথ সিটি মলের প্রথম দুর্গাপুজোর ভাবনায় শিল্পী শুভঙ্কর দত্ত, উপস্থিত শমীক ভট্টাচার্য

কলকাতা: বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল দক্ষিণ কলকাতার সাউথ সিটি মলে। প্রথমবারের জন্য এই মলে আয়োজিত হল সম্পূর্ণাঙ্গ দুর্গাপুজো। পূর্ব ভারতের কোনও শপিং মলে এই ধরনের পূর্ণাঙ্গ দুর্গাপুজোর আয়োজন এক অভিনব উদ্যোগ। এমনকী, সারা ভারতেও শপিং মলের পরিসরে এই ধরনের আয়োজন বিরল এক দৃষ্টান্ত। আধুনিক নগরজীবনের অন্যতম পরিচিত পরিসরে বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও উৎসবের আবহকে তুলে ধরতেই এই বিশেষ উদ্যোগ।

শিল্পী শুভঙ্কর দত্তের ভাবনায় এবারের পুজোর থিম ‘যাত্রা’। নামের মধ্যেই রয়েছে সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাপন, কেনাকাটা এবং সামাজিক মেলবন্ধনের বিবর্তনের গল্প। একসময় গ্রামবাংলার হাট ছিল কেনাকাটা, মানুষের মিলন এবং সামাজিক আদানপ্রদানের অন্যতম কেন্দ্র। সময়ের সঙ্গে সেই হাটের জায়গা নিয়েছে আধুনিক শপিং মল। হাট থেকে শপিং মল—এই দীর্ঘ পথচলাকেই শিল্পের ভাষায় তুলে ধরেছে ‘যাত্রা’। অতীতের স্মৃতি ও বর্তমানের আধুনিকতার মেলবন্ধনে এই থিম হয়ে উঠেছে বাংলার পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রার এক প্রতিচ্ছবি।

এই থিমের অন্যতম আকর্ষণ বাংলার বনেদি বাড়ির ঐতিহ্য ও আভিজাত্যের উপস্থাপনা। মণ্ডপসজ্জার ভাবনায় রয়েছে পুরনো দিনের বনেদিয়ানা, শিকড়ের টান এবং বাঙালির চিরাচরিত উৎসবের আবহ। আধুনিক শপিং মলের পরিসরের মধ্যে সেই ঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন শিল্পী শুভঙ্কর দত্ত। ফলে ‘যাত্রা’ শুধুমাত্র কেনাকাটার বিবর্তনের গল্প নয়, বরং বাংলার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরারও এক সৃজনশীল প্রয়াস।

সাউথ সিটি মলের এই প্রথম দুর্গাপুজোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিজেপি নেতা শমীক ভট্টাচার্য। পুজোর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সাম্প্রতিক সামাজিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “দুর্গাপুজো ব্যাহত হচ্ছিল কয়েক বছর আগে। অনেক মানুষ পুজো করতে ভয় পাচ্ছিলেন। অনেক জায়গায় ঢাক বাজানো নিষিদ্ধ ছিল। অনেক জায়গায় বিসর্জন কবে হবে সরকার বা পুলিশ নির্ধারিত করে দিত। কিন্তু এবার সামগ্রিকভাবে একটা সামাজিক পরিবর্তন এসে গেছে। পশ্চিমবঙ্গ সহ কলকাতা শহরে পুজোর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। শহরের একটি বড় মলে এরকম অপূর্ব মণ্ডপ সজ্জা একটা নির্দিষ্ট সময়কে মনে করিয়ে দিচ্ছে।”

শিল্পী শুভঙ্কর দত্ত এই বিশেষ উদ্যোগের নেপথ্যে সম্মিলিত প্রচেষ্টার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “সম্পূর্ণ টিমের সহযোগিতা ছাড়া এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত করা সম্ভব হত না।” তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, এমন একটি অভিনব আয়োজন বাস্তবায়িত করতে সৃজনশীল পরিকল্পনার পাশাপাশি গোটা দলের সমন্বিত প্রচেষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাউথ সিটি মলের প্রথম দুর্গাপুজো তাই শুধুমাত্র একটি নতুন উৎসবের সূচনা নয়, বরং আধুনিক শহুরে পরিসরে বাংলার ঐতিহ্যকে উদ্‌যাপনের এক নতুন প্রচেষ্টা। ‘যাত্রা’র মধ্য দিয়ে হাটের স্মৃতি, বনেদি বাড়ির আভিজাত্য এবং আধুনিক শপিং মলের অভিজ্ঞতা এক সুতোয় বাঁধা হয়েছে। সময় বদলেছে, বদলেছে কেনাকাটার পরিসর, কিন্তু বাঙালির দুর্গোৎসবের আবেগ ও শিকড়ের টান আজও অমলিন—সাউথ সিটি মলের এই উদ্যোগ যেন সেই চিরন্তন সত্যকেই নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *