‘দুর্গতিনাশিনী’ উদ্যোগে নারীর আত্মশক্তির বার্তা

স্তনস্বাস্থ্যের দায়িত্ব নিজেকেই নেওয়ার আহ্বান মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাসের

কলকাতা, ৬ অক্টোবর ২০২৬: স্তন ক্যানসার একজন নারীর জীবনে এক কঠিন স্বাস্থ্যসংগ্রাম হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যথাযথ সচেতনতা, প্রারম্ভিক রোগনির্ণয় এবং সময়োপযোগী চিকিৎসা এই সংগ্রামের পরিণতিকে বহুলাংশে পরিবর্তিত করতে সক্ষম। স্তন ক্যানসার সচেতনতা মাস উপলক্ষে মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাস ‘দুর্গতিনাশিনী – নিজের দুর্গতিনাশিনী নিজেই’ শীর্ষক এক বিশেষ সচেতনতামূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে নারীদের নিজেদের স্তনস্বাস্থ্য সম্পর্কে সজাগ হওয়া, শরীরে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দ্রুত অনুধাবন করা এবং বিলম্ব না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
উৎসবের আবহে নারীর শক্তি, সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে অবিচল লড়াইয়ের মানসিকতাই এই উদ্যোগের মূল প্রেরণা। কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার নন্দিতা রায় এবং ভারতীয় মডেল তথা ২০১১ সালের মিসেস ইন্ডিয়া খেতাবজয়ী রিচা শর্মা। তাঁদের উপস্থিতি নারীর অন্তর্নিহিত শক্তি, সাহস ও আত্মমর্যাদার বার্তাকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
‘দুর্গতিনাশিনী’ উদ্যোগের তাৎপর্য কেবল ক্যানসার ধরা পড়ার পর তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নিজের শরীরকে চেনা, অস্বাভাবিক কোনও পরিবর্তনকে অবহেলা না করা, নিজের স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং যথাসময়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াও নারীর আত্মরক্ষার অপরিহার্য অঙ্গ—এই বোধকেই সামনে আনা হয়েছে প্রচারে।
মহিলাদের মধ্যে স্তন ক্যানসার এখনও এক গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য-সমস্যা। ফলে এই রোগ সম্পর্কে সুগভীর সচেতনতা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগনির্ণয় চিকিৎসার সাফল্য বৃদ্ধিতে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। চিকিৎসার যাত্রা হাসপাতালের দ্বারপ্রান্তে এসে শুরু হয় না; তার সূচনা আরও আগে—নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতনতা, পরিবর্তন শনাক্ত করার সক্ষমতা এবং প্রয়োজনবোধে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আত্মবিশ্বাস থেকে।
এই প্রসঙ্গে ডা. নেহা চৌধুরী, সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও বিভাগীয় প্রধান, সার্জিক্যাল অনকোলজি, মণিপাল হাসপাতাল, মুকুন্দপুর ক্লাস্টার, বলেন, “‘দুর্গতিনাশিনী’-র বার্তা শুধুমাত্র স্তন ক্যানসারের প্রচলিত ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মহিলাদের সাহসকে সম্মান জানায় এবং তাঁদের নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণের আহ্বান জানায়। ক্যানসারের চিকিৎসার সমগ্র পর্বে মানসিক ও সামাজিক সহায়তার গুরুত্ব অপরিসীম। স্তন ক্যানসার থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা বহু মানুষের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, চিকিৎসা ও উপযুক্ত চিকিৎসাব্যবস্থার পাশাপাশি পরিবার, বন্ধু এবং পরিচর্যাকারীদের উৎসাহ রোগীর মানসিক দৃঢ়তা বৃদ্ধি করে এবং রোগনির্ণয় থেকে আরোগ্যের কঠিন পথ অতিক্রম করতে সহায়তা করে।”
অনুষ্ঠানে ডা. পূজা আগরওয়াল, কনসালট্যান্ট, সার্জিক্যাল অনকোলজি, মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাস, বলেন, “রোগ দ্রুত শনাক্ত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা ৪০ বছরের বেশি বয়সি সমস্ত মহিলাকে বছরে একবার স্তনের এক্স-রে পরীক্ষা, অর্থাৎ ম্যামোগ্রাম করানোর পরামর্শ দিই। অপেক্ষাকৃত কম বয়সি মহিলাদের নিয়মিত নিজেদের স্তন পরীক্ষা করা উচিত। ভারতে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ৬১ শতাংশের ক্ষেত্রে রোগটি অনেকটা অগ্রসর হওয়ার পর শনাক্ত হয়। বিপরীতে, অল্পসংখ্যক রোগী রোগের প্রাথমিক পর্যায়েই চিকিৎসার জন্য আসেন। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন কারণের পাশাপাশি সচেতনতার অভাবও এই পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ।”
তিনি আরও বলেন, “স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় চিকিৎসকের দক্ষতার পাশাপাশি রোগীর নিজের যত্ন নেওয়ার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণেই আমরা প্রত্যেক রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা, নির্ভুল রোগনির্ণয়, রোগের পর্যায় নির্ধারণ এবং সুসংবদ্ধ চিকিৎসা-পরিকল্পনার উপর গুরুত্ব দিই। অস্ত্রোপচার হোক অথবা অন্য কোনও চিকিৎসাপদ্ধতি—প্রতিটি পর্যায়ই বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বিত দলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যাতে রোগী সর্বোত্তম চিকিৎসাফল লাভ করতে পারেন। একইসঙ্গে চিকিৎসায় রোগীর সক্রিয় অংশগ্রহণ, আত্মপরিচর্যা, সুষম পুষ্টি এবং মানসিক সহায়তাও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। পরিবার ও বন্ধুবান্ধবের পাশে থাকা এই কঠিন সময়ে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তাঁদের সমর্থন রোগীর আত্মবিশ্বাস ও লড়াইয়ের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করে।”
উদ্যোগটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে ডা. সৌরভ দত্ত, ডিরেক্টর, মণিপাল কমপ্রিহেনসিভ ক্যানসার কেয়ার সেন্টার, ব্রডওয়ে ও মুকুন্দপুর ক্লাস্টার, কলকাতা, বলেন, “স্তন ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতা কোনও একটি মাসের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। মহিলাদের নিজেদের শরীরকে বুঝতে, অস্বাভাবিক পরিবর্তন শনাক্ত করতে এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে উৎসাহিত করাই এর মূল উদ্দেশ্য। রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে চিকিৎসার সমগ্র প্রক্রিয়ায় তার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়ে। ‘দুর্গতিনাশিনী’ প্রচারের মাধ্যমে আমরা এই বার্তাই দিতে চাই যে, নিজের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষমতা প্রত্যেক মহিলার নিজের হাতেই রয়েছে।”
এই প্রচারের মধ্য দিয়ে স্তন ক্যানসারকে ঘিরে ভয় ও সংকোচ দূরে সরিয়ে আত্মবিশ্বাস, সাহস এবং ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে রোগটির মোকাবিলা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ক্যানসার থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা এবং বর্তমানে চিকিৎসাধীন রোগীদের অভিজ্ঞতায়ও বারবার উঠে এসেছে আত্মবিশ্বাস, মানসিক দৃঢ়তা এবং পরিবার-পরিজনের নিরন্তর সহযোগিতার গুরুত্ব। এর আগে আয়োজিত স্তন ক্যানসার থেকে আরোগ্যলাভকারী রোগীদের এক সভাতেও তাঁরা জানিয়েছিলেন যে, যথাযথ চিকিৎসা, চিকিৎসকদের আশ্বাস এবং পরিবারের নিরবচ্ছিন্ন সহায়তা তাঁদের আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার করে স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনে সাহায্য করেছে।
তবে স্তন ক্যানসারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুধুমাত্র নারীদের বিষয় নয়। সাধারণভাবে স্তন ক্যানসারকে নারীদের রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও পুরুষদেরও এই রোগ হতে পারে, যদিও এমন ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল। তাই পুরুষদের ক্ষেত্রেও স্তন বা বুকের অংশে কোনও অস্বাভাবিক পরিবর্তন কিংবা গাঁট দেখা দিলে তা অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
কলকাতার ৬২ বছর বয়সি অশোক চক্রবর্তীর ক্ষেত্রেও ডান দিকের বুকে একটি শক্ত গাঁট থেকেই চিকিৎসাযাত্রার সূচনা হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রথমে তাঁকে হরমোন-ভিত্তিক চিকিৎসা দেওয়া হয়, যাতে গাঁটটি চিকিৎসায় সাড়া দেয় কি না তা পর্যবেক্ষণ করা যায়। চিকিৎসায় সাড়া মিললেও গাঁটটি সম্পূর্ণরূপে নির্মূল হয়নি। পরবর্তীতে চিকিৎসকেরা সম্পূর্ণ স্তন অপসারণের অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন।
বর্তমানে মি. চক্রবর্তী সুস্থতার পথে এগিয়ে চলেছেন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে তিনি ওষুধ ও হরমোন-ভিত্তিক চিকিৎসাও চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে—স্তন ক্যানসার পুরুষদেরও হতে পারে। অতএব স্তন কিংবা বুকের অংশে কোনও অস্বাভাবিক পরিবর্তন, গাঁট বা অন্য কোনও সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে কোনওভাবেই তা উপেক্ষা করা উচিত নয়।
মণিপাল হাসপাতাল সম্পর্কে: মণিপাল হাসপাতাল ভারতের অন্যতম অগ্রণী সমন্বিত স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। দেশের ১৪টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ৫০টি বহুবিভাগীয় হাসপাতাল এবং ১৩,০০০-এরও বেশি লাইসেন্সপ্রাপ্ত শয্যা নিয়ে এর সর্বভারতীয় পরিসর গড়ে উঠেছে। ১১,০০০-এর বেশি চিকিৎসক এবং ২৫,০০০ কর্মীর সমন্বয়ে পরিচালিত এই নেটওয়ার্ক শয্যাসংখ্যার বিচারে দেশের বৃহত্তম বহুবিভাগীয় হাসপাতাল-নেটওয়ার্ক। উন্নত প্রযুক্তি, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং রোগীকেন্দ্রিক চিকিৎসার সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের রোগী-সহ ৭০ লক্ষেরও বেশি মানুষের চিকিৎসাসেবা প্রদান করে। চিকিৎসা ও পরিচালনাগত উৎকর্ষের স্বীকৃতি হিসেবে মণিপাল হাসপাতালগুলির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান NABH এবং AAHRPP স্বীকৃতিপ্রাপ্ত; একাধিক হাসপাতাল NABL স্বীকৃতির পাশাপাশি নার্সিং ও জরুরি চিকিৎসা পরিষেবাতেও বিশেষ কৃতিত্ব অর্জন করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *