রাধা-কৃষ্ণের চিরন্তন প্রেম ও মিলনের ভাবনায় ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে এবারের পুজো
কলকাতা, ৫ অক্টোবর ২০২৬: ৭৭ বছরে পা দিল ঢাকুরিয়া শহিদনগর সর্বজনীন দুর্গোৎসব। এবারের দুর্গাপুজোর মূল ভাবনা ‘মহামিলন’—যার অন্তর্নিহিত প্রেরণা রাধা ও কৃষ্ণের চিরন্তন ও ঐশ্বরিক বন্ধন। প্রেম, ভক্তি, সম্প্রীতি ও একাত্মতার চিরন্তন বার্তাকে সামনে রেখেই এবারের আয়োজন। একইসঙ্গে এই ভাবনার মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হবে দীর্ঘ ৭৭ বছরের পুজো-পরম্পরায় এলাকার মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ও সম্প্রীতির চিত্র।
আগামী ১৩ অক্টোবর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬টা থেকে ঢাকুরিয়ার ১ নম্বর শহিদনগর, শহিদনগর সংঘ প্রাঙ্গণে এই পুজোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে।
‘মহামিলন’-এর মাধ্যমে আয়োজকদের বার্তা, প্রকৃত সম্প্রীতি কোনও ভেদাভেদকে স্বীকার করে না। প্রেম, ভক্তি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মধ্য দিয়েই মানুষ একে অপরের কাছাকাছি আসে। সর্বজনীন দুর্গোৎসবও সেই সামাজিক চেতনারই প্রতিফলন, যেখানে বিভিন্ন পটভূমির মানুষ একত্রিত হয়ে দেবীর আরাধনা, উৎসবের আনন্দ এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য ভাগ করে নেন।
এবারের পুজোর উপস্থাপনায় ঐতিহ্যের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মা দুর্গার প্রতিমা তৈরি হবে সাবেকি রীতিতে, যা সনাতনী ঐতিহ্যের চিরায়ত সৌন্দর্য ও ভক্তিমূলক আবহকে অক্ষুণ্ণ রাখবে। এর সঙ্গে ‘মহামিলন’-এর ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু সূক্ষ্ম শৈল্পিক উপাদান সংযোজিত হবে।
মণ্ডপেও দেখা যাবে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার নান্দনিক সমন্বয়। বাঁশ ও খড়ের মতো চিরাচরিত উপকরণের পাশাপাশি ব্যবহার করা হবে ইস্পাত, লোহা, ক্যানভাস এবং আধুনিক শিট। এর ফলে প্রাচীন কারুশিল্প ও সমকালীন শিল্পভাবনার মধ্যে তৈরি হবে এক অভিনব শিল্প-সংলাপ।
এবারের পুজোর ভাবনা, মণ্ডপ পরিকল্পনা ও শিল্পনির্মাণের দায়িত্বে রয়েছেন শিল্পী শ্রী অভীক সেন ও শ্রী শুভম বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে আয়োজকদের বক্তব্য, এই পুজো কোনও একক শিল্পীর প্রয়াস নয়; ক্লাবের সদস্য এবং এলাকার বাসিন্দাদের সম্মিলিত উদ্যোগেই ৭৭ বছরের এই ঐতিহ্যকে নতুন রূপে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
পুজো প্রাঙ্গণে থাকবে একটি ছোট মেলা। সেখানে হস্তশিল্প, পাটজাত সামগ্রী, খাদ্যসামগ্রী-সহ বিভিন্ন স্থানীয় পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রির ব্যবস্থা থাকবে। এর মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পী, কারিগর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তাঁদের পণ্য মানুষের সামনে তুলে ধরার সুযোগ পাবেন।
শিশু-কিশোরদের জন্য আয়োজিত হবে জনপ্রিয় ‘খুদে কিশোরের মেলা’। সেখানে অঙ্কন, গান, আবৃত্তি ও কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন থাকবে। এর মাধ্যমে উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি শিশুদের সৃজনশীলতা ও প্রতিভা বিকাশের সুযোগও তৈরি হবে।
সমগ্র পুজো সনাতনী রীতি ও ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠান মেনেই সম্পন্ন হবে। পুজোর দিনগুলিতে আলাদা করে কোনও বৃহৎ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন রাখা হয়নি। তবে দীর্ঘদিনের রীতি অনুসরণ করে পুজো-পরবর্তী সময়ে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।
সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রেও বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন আয়োজকরা। এলাকার আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা শিশু ও প্রবীণদের মধ্যে নতুন পোশাক বিতরণ করা হবে। বিশেষত যাঁদের পক্ষে নতুন পোশাক কেনা সম্ভব নয়, তাঁদের উৎসবের আনন্দ ও মর্যাদার অংশীদার করে তুলতেই এই উদ্যোগ।
একজন শ্রদ্ধেয় স্বামীজির হাত ধরে ভারত সেবাশ্রম সংঘের পক্ষ থেকে পুজোর উদ্বোধন হবে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শ্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং রাজ্যপাল শ্রী আর. এন. রবি-কেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এছাড়াও একাধিক মন্ত্রিসভার সদস্য এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের উপস্থিতির সম্ভাবনা রয়েছে।
ঢাকুরিয়া শহিদনগর সর্বজনীন দুর্গোৎসবের সভাপতি শ্রী প্রীতম দত্ত বলেন,
“আমাদের কাছে দুর্গাপুজো শুধুমাত্র একটি বার্ষিক উৎসব নয়; এটি এমন এক আবেগ, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে সংযুক্ত করে এবং সমগ্র পাড়াকে একসূত্রে বাঁধে। আমাদের পুজোর ৭৭তম বর্ষে আমরা গভীরভাবে কৃতজ্ঞ যে আমাদের পূর্বপুরুষদের স্নেহ ও নিষ্ঠায় শুরু করা এই ঐতিহ্য আমরা আজও বহন করে চলেছি।
তিনি আরও বলেন, “এবারের ‘মহামিলন’ ভাবনা প্রেম, ভক্তি, সম্প্রীতি ও একাত্মতার চিরন্তন চেতনাকে তুলে ধরে। রাধা ও কৃষ্ণের ঐশ্বরিক মিলন যেমন সমস্ত ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে এক বন্ধনের প্রতীক, তেমনই আমরা চাই আমাদের পুজোও সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মিলনক্ষেত্র হয়ে উঠুক।
শ্রী দত্তের কথায়, “আমার আন্তরিক কামনা, আমাদের পুজোয় যাঁরা আসবেন, তাঁরা প্রত্যেকেই যেন আপনজনের উষ্ণতা অনুভব করেন। মা দুর্গা যেন প্রতিটি পরিবারকে শান্তি, সুখ ও শক্তিতে পরিপূর্ণ করেন এবং পুজো শেষ হওয়ার পরেও আমাদের মধ্যে একতার এই চেতনা অটুট থাকে।”
আয়োজকদের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে, প্রতিযোগিতা নয়, ৭৭ বছরের পাড়ার ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই তাঁদের মূল লক্ষ্য। ভক্তি, আনন্দ ও সামাজিক সম্প্রীতির আবহে সকলকে একত্রিত করাই এবারের পুজোর প্রধান উদ্দেশ্য।
‘মহামিলন’-এর আহ্বানে তাই ৭৭তম ঢাকুরিয়া শহিদনগর সর্বজনীন দুর্গোৎসব হয়ে উঠতে চলেছে ঐতিহ্য, ভক্তি, সম্প্রীতি ও সম্মিলিত আনন্দের এক বৃহৎ উৎসব।
পুজোর তথ্য:
পুজো: ৭৭তম ঢাকুরিয়া শহিদনগর সর্বজনীন দুর্গোৎসব
ভাবনা: ‘মহামিলন’ — The Great Union
শিল্পী: শ্রী অভীক সেন ও শ্রী শুভম বন্দ্যোপাধ্যায়
উদ্বোধন: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬টা থেকে
স্থান: শহিদনগর সংঘ প্রাঙ্গণ, ১ নম্বর শহিদনগর, ঢাকুরিয়া, কলকাতা–৭০০০৩১


